ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭, ১৬ চৈত্র ১৪২৩

মুশফিক চিৎকার করে, আমার চোখ ভিজে আসে। মিরাজ ছেলেটা চিৎকার করে করে ছুটতে থাকে, আমার চোখে পানি চলে আসে

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়: বয়স বেড়ে যাচ্ছে। শরীরের এখানে ওখানে ব্যাথা বয়সটা জানান দেয়। ইদানিং চোখেও ঝাপসা দেখি। ডাক্তার একটা চশমা দিয়ে বলেছেন, ‘চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। তাই ঝাপসা দেখি।’

আজ শুকানো সেই চোখে আবার পানি চলে এলো কোত্থেকে!

মুশফিক চিৎকার করে, আমার চোখ ভিজে আসে। মিরাজ ছেলেটা চিৎকার করে করে ছুটতে থাকে, আমার চোখে পানি চলে আসে। আমাদের গ্রাফিক্স ডিজাইনার পিন্টু ভাইয়ের আজ ছিলো ছুটি। অফিসে ফোন করে বললেন, ‘এমন দিনে বাসায় মন টেকে না’।

আমার চোখে পানি।

আমি ভাবি, আবার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। কিন্তু মাথা তুলে দেখি আশেপাশের সবাই চোখ মুছছে। সবার চোখে অসুখ হলো নাকি? নইলে এতো চোখের জল কোত্থেকে এলো!

আমি সুখের মাছি।

সাংবাদিকতা যখন শুরু করেছি, ততোদিনে বাংলাদেশ একটা দুটো ওয়ানডে জিততে শিখেছে। একেবারে বছরের পর বছর না জেতার যন্ত্রণা সইতে হয়নি। তারপরও কিছুটা যন্ত্রনা সয়েছি।

দিনের পর দিন অফিসে ফিরে ‘আপনার দল তো হেরে গেলো’ শুনে মাথা নিচু করে থেকেছি। র‌্যাগিং সহ্য করেছি।

সব কাজের মতো ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ারও অনেক যন্ত্রণা আছে।


প্রথম যন্ত্রনা হল, পরিচিত মহলে নিয়মিত শোনা, ‘এবার তো ফ্রি বিদেশ ঘুরতে পারবা, ফ্রি খেলা দেখবা’। দ্বিতীয় যন্ত্রনা টিকিটের আবদার।

তবে তৃতীয় এই যন্ত্রনাটিই বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিকদের জন্য ভয়াবহতম যন্ত্রনা। দল হারলেই সবাই পঙ্গপালের মতো ছুটে আসে। অফিস কলিগ থেকে মোড়ের চায়ের দোকানদার; সবার ভাষা একই, ‘আপনারা ফুলায়ে লেখেন বলে এরা এতো হারে। গালি দিতে পারেন না?’

পত্রিকার পাতায় গালি দেওয়া যায় না, সেটা আমার কাজ না, জাতীয় দল মানে অনেক বড় ব্যাপার; এসব বলে পার পাইনি কোনোদিন। সবসময় দলের হারের সঙ্গে এইসব গালি জোটে আমাদের কপালে। এটা নিয়তি বলে মনে নিয়েছি।

এবার যেটা হল, মানতে পারলাম না। ইত্তেফাকের এক সহকর্মী আজ ম্যাচের পর এগিয়ে এসে বললেন, ‘অভিনন্দন’।

আমি অবাক হয়ে তাকাতেই উনি বললেন, ‘এনিহাউ আপনারাও দেশের ক্রিকেটের অংশ; এতো বড় সাফল্যে কিছু অবদান তো আছেই সাংবাদিকদের।’

বছরের পর বছর তেতো কথা সহ্য করা আমার সিনিয়র ক্রিকেট সাংবাদিকদের কথা ভেবে চোখে জল এলো।

আসলেই চোখের অসুখটা বাড়ছে।

এই অসুখটাকে ইদানিং সুখে পরিণত করেছে মাশরাফি আর মুশফিকের দল। ২০১৪ অবধি আমরা মেনেই নিয়েছিলাম, বাংলাদেশের জয় এক হ্যালির ধুমকেতুর মতো ব্যাপার; যুগে একবার আসবে।

কিন্তু এই ছেলেগুলো নাছোড়বান্দা। টানা জিততেই থাকে। পাকিস্তানকে হোয়াই ওয়াশ করে, ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারায়, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন দিনে টেস্ট জেতে। আজ তো সব সীমা ছাড়িয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে এলো।

আমরা অনেক সমালোচনা করি।

এই এক জয়ে সব সমালোচনা মিথ্যে হয়ে যায় না। আজ এই চোখের জলে ভাসার সময়েও বলি, অবশ্যই সমালোচনাগুলো জয়ে ভেসে যায় না। কিন্তু বুকটা ভরে ওঠে এই ভেবে যে, এতো সব সমালোচনার যোগ্য দুর্বলতা থাকার পরও এই সোনার ছেলেগুলো সত্যিই জয় এনে এনে দেয় হাতে।

এমন একটা জয়ের দিনে উৎসব করার চেয়ে লোকে আমাদের, সমালোচকদের একটু গালি দিতে ভালোবাসে। ইনবক্স খুলে খুলে গালিগুলো পড়ি। মনটা ভরে যায়, প্রতিটা গালি তো আসলে দলের প্রতি ভালোবাসা।

এই গালিও আমার চোখে জল এনে দেয়।

চোখটা মুছেও কুলাতে পারি না। নাহ, বয়সটা বেড়েই যাচ্ছে।-খেলাধুলা

Posted by Newsi24

এ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

খেলা এর সর্বশেষ খবর



রে