ঢাকা, সোমবার, ২৯ মে ২০১৭, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪

খোকার ‘সাম্রাজ্যে’ আব্বাসের হানা, উত্তরে কাইয়ুমের আধিপত্য

বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘুরে-ফিরে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাস। নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে অব্যাহতি পেয়েছেন নগর বিএনপির এই দুই ‘মহারথী’। তবে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি। বরং ব্যক্তি আধিপত্য ধরে রাখতে নিজ নিজ বলয় লোকদের কমিটিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, দেরিতে হলেও সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বের অবসান হয়েছে। তবে তাদের বলয় মুক্ত হতে পারেনি। আবার কেউ কেউ এরই মাঝে খুঁজে পাচ্ছেন ‘আশার আলো’। এই কমিটি রাজপথে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে এমন যোগ্যতা রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস।

জানা গেছে, ঢাকা মহানগর বিএনপিতে এক সময় খোকার একক আধিপত্য ছিল। কারণ তিনি দীর্ঘদিন সিটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। এক সময় মির্জা আব্বাসও মেয়র ছিলেন। তারও একটা বলয় আছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মহানগর কমিটি করতে গেলে এই দুই নেতার বাইরে যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাস্তবতাও তাই ছিল। কিন্তু গত কমিটিতে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সদস্য সচিব করা হলেও মির্জা আব্বাস তাকে ভালোভাবে নেননি। যার প্রভাব বিগত আন্দোলনে পড়ে। এসবের বিচার বিশ্লেষণ করে নতুন কমিটি করা হয়েছে। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। এর মধ্যে একজন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে, নতুন কমিটিতে মির্জা আব্বাসের বলয়ের লোকদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সাদেক হোসেন খোকার বলয়ের লোকরা অনেকটা কোণঠাসা। খোকার লোক হিসেবে পরিচিতদের কমিটিতে রাখা হলেও তাদের ঠাঁই হয়েছে অপেক্ষকৃত নিচের দিকে।

উত্তরের সভাপতি এম এ কাইয়ুম অবশ্য খোকা-আব্বাস দুইজনের সঙ্গেই সমন্বয় রাখেন। তার একক আধিপত্য স্পষ্ট হয়েছে উঠেছে। উত্তরের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন কাইয়ুম বলয়ের লোকেরাই বেশি।

তবে বিএনপির প্রায় ৬ জন নেতা বলেন, ‘খোকা-আব্বাসের অনুসারীদের সম্বন্বয়ে মহানগর কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখানে কারো ক্ষোভ থাকার কথা নয়। দুই এক জন বাদ পড়েছেন তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রাখা হবে।’

নবগঠিত ঢাকা নগর কমিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অনেকটা তারুণ্য নির্ভর মহানগর কমিটি হয়েছে। আগের শিক্ষা নিয়ে আগামী দিন তারা দলের জন্য কাজ করে যাবেন।’

প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংগঠন যদি শক্তিশালী হয় তাহলে তাদের কাছে থেকে তো আশা করা যায়ই। আমরা চাই আগামী দিনে নতুন কমিটির নেতারা দলের জন্য সংগঠনের জন্য কাজ করবে। রাজপথ আন্দোলেনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নেত্রীর (খালেদা জিয়া) তত্ত্বাবধানে একটি সত্যিকার অর্থে ভালো কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সেই কমিটিতে পরীক্ষিত সৈনিকদের স্থান দেওয়া হয়েছে। কমিটির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, যে সমস্ত পদ এখনও শূন্য আছে সেখানেও কাউকে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধারের আন্দোলনে নবগঠিত ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং সফল হবেন।’

নগর বিএনপি (উত্তর) সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত এম কাইয়ূম দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। সেক্ষেত্রে তাকে দিয়ে দায়িত্ব পালন কতটা সম্ভব হবে? জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘মিথ্যা মামলায় যাদেরকে দূরে রাখা হয়েছে তাদের মধ্যে (এম কাইয়ূম) যাদেরকে এই কমিটিতে রাখা হয়েছে তারা যে ভূমিকা রাখতে পারবেন না তা নয়, বরং তারাও একটি বড় ভূমিকা রাখবেন বলে বিশ্বাস করি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর বিএনপির (দক্ষিণ)সভাপতি এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ক্ষোভ, দুঃখ থাকবে না। বরং ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ে সবাইকে নিয়েই আগামীর আন্দোলন করা হবে। তাছাড়া যারা পদ পায় নাই তাদের ক্ষেত্রে এখনও অনেক সুযোগ আছে। সে ব্যাপারে বিবেচনা করা হবে।

মঙ্গলবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি হয়েছেন বর্তমান কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক এম এ কাইয়ুম। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আহসান উল্লাহ হাসান। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সভাপতি ও আবুল বাশারকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। একমাসের মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে তারুণ্য নির্ভর কমিটি করা হয়েছে। যারা বিগত দিনে আন্দোলনে সংগ্রামে ছিলেন তাদের থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তাদের পরিচয় হলো আগামী দিনে আন্দোলন সংগ্রামে কেমন ভূমিকার রাখেন।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, ‘দীর্ষদিন পর হলেও তারুণ্য নির্ভর একটি কমিটি হয়েছে। কমিটি ভালোই হয়েছে। কারণ এর বাইরে তো আর কেউ নেই। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। আমরা আশা করছি আগামী দিনে এই নতুন কমিটি গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ের লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘সকলের সমন্বয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখানে কে কার লোক বড় কথা নয়। তারুণ্য নির্ভর কমিটি করা হয়েছে। এটা করতে পারাটাও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আশা করি আমাদের প্রত্যাশা পূরণে এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা কথা জানা গেছে, মহানগর উত্তর ৬৬ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটিতে মুণ্সি বজুলল বাসিত আনজু, আবদুল আলীম নকীসহ উপরের সারির বেশ কয়েকজন মির্জা আব্বাসের অনুসারী। এছাড়া ১৫ জনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এর মধ্যে দুইজনের নাম ঘোষণা বাকী আছে। তবে এখানে প্রথম দুইটি পদের পরে কফিল ও শামীম পারভেজ আবার খোকার লোক হিসেবে পরিচিত। এভাবে খোকা বলয়ের লোকেদের নিচের দিকে রাখা হয়েছে।
এদিকে মহানগর দক্ষিণ ৭০ সদস্য বিশিষ্ট অংশিক কমিটি শামছুল হুদা, ইউনুস মৃধাসহ সহ-সভাপতি পদে আব্বাসের অনুসারীদের রাখা হয়েছে। এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পদক পদে প্রথম সারিতে রাখা হয়েছে- আব্বাসের অনুসারী হাবীবুর রশিদ হাবীব, আনম সাইফুল ইসলাম, হারুণ অর রশিদসহ আরও অনেককে। এখানে খোকা বলয়ের লোকেরা কোণঠাসা।

১৯৯৬ সাল থেকে সাদেক হোসেন খোকা বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। মাঝপথে খোকার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে ১/১১ এ মহানগর কমিটি ভেঙে দেন দলের তখনকার মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। এরপর ২০১১ সালের ১৪ মে যুক্তরাজ্য সফরে যাওয়ার রাতে খালেদা জিয়া ওইসময় অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে আহ্বায়ক ও আবদুস সালামকে সদস্য সচিব করে ২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেন। ছয় মাসের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরের সব ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালন করলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি। এছাড়া সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজধানীতে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি তারা। একসময় ব্যর্থতার দায় নিয়ে মহানগর বিএনপি থেকে নিজেই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন খোকা।

এরপর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সদস্য সচিব করে ২০১৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠিত এ কমিটিকে ১ মাসের মধ্যে সব ওয়ার্ড ও থানা কমিটি এবং ২ মাসের মধ্যে মহানগর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কমিটি গঠনে ব্যর্থ হন তারা। এরপর প্রায় তিন বছরেও বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৮ মে চিকিৎসার জন্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন।

Posted by Newsi24

রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর



রে